Saturday, December 3, 2016

আদর্শ মানুষ প্রসঙ্গে

(উদ্দেশ্য: এই লেখাটিকে লেখক সম্পূর্ণভাবে মৌলিক বলে কোনমতেই দাবী করেন না। যে ধারণাটি লেখাটিতে তুলে ধরা হয়েছে, তা অনেক মহান লেখক অনেকভাবে পাঠকদের জানিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন কাজের চাপে আমরা সেসব কিছু ভুলতে বসেছি। আবার ইদানীংকালে আমরা এর অভাব প্রচণ্ডরকমভাবে অনুভব করছি। সেই কারণে, এই বহুলরচিত, বহুপঠিত এবং ইদানীংকালে বিস্মৃতপ্রায় লেখাটিকে নতুন আঙ্গিকে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো। যদি কিছু পাঠক তাঁদের জীবনের আদর্শকে খুঁজে পেয়ে সঠিক পথে পা বাড়ান, তাহলে লেখাটির উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে বলা যায়|)
লেখাটির নামকরণ দেখেই কেমন একটা গুরুগম্ভীর ভাব চলে আসে। আদর্শ মানুষ। কেন জানব। সত্যিই কি আদর্শ মানুষ সম্বন্ধে কিছু জানার প্রয়োজন আছে। আমাদের জীবন তো বেশ কেটে যাচ্ছে। সেখানে আবার হঠাৎ আদর্শ-তাদর্শ নিয়ে টানাটানি কেন। এই তো বেশ ভালো আছি। খাচ্ছি-দাচ্ছি-অফিস যাচ্ছি-ঘুমোচ্ছি। দিন তো ভালো কাটছে। ভালো না লাগলে এর শাপান্ত করছি এবং আবার খাচ্ছি-দাচ্ছি-অফিস যাচ্ছি-ঘুমোচ্ছি। বেশ ভালো আছি। বলা যায় একপ্রকার সুখেই আছি। সেখানে আবার আদর্শ নিয়ে কথা বলে নিজেকে অস্থির করা কেন। আদর্শ না থাকলে কি এমন সুখে থাকতাম। কিন্তু সুখ কি-সেটা কি আমরা জানি। যাকে সুখ বলে ভাবছি, সেটাই কি আসল সুখ।   
রবীন্দ্রনাথ তাঁর কর্ণকুন্তীসংবাদ শেষ করছেন কর্ণের প্রার্থনা দিয়ে;
"শুধু এই আশীর্বাদ দিয়ে যাও মোরে,
জয়লোভে যশলোভে রাজ্যলোভে অয়ি,
বীরের সদগতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই ।"
কর্ণের এই প্রার্থনা, এই আকুতি নিশ্চয়ই দুঃখের জন্য নয়। কিন্তু এ কেমন সুখ। আজকের দিনে আমরা যেখানে জয়-যশ-রাজ্য-এর পিছনে ছুটে চলেছি এক টুকরো তথাকথিত সুখের সন্ধানে। সেখানে সেই মহাভারতীয় যুগে জয়-যশ-রাজ্য এর পিছনে ছুটে চলাটা সুখের সন্ধানে ছোটা ছিল না। তাহলে কি সুখ মানে অন্য কিছু। তাহলে কি তার সঙ্গে অন্য কিছুর যোগ আছে। সেটা কি আদর্শ? যেখানে আজকের চরম ব্যস্ততার দিনে, অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে, আমরা মরিয়া হয়ে ছুটে চলেছি মরীচিকা সম সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সন্ধানে। কিন্তু দিনের শেষে আমরা কি তা পাই। নাকি পরের দিন আরো জোরে ছোটার বাসনা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। এইভাবে দিনের পর দিন পাহাড়প্রমাণ চাপের বোঝা নিয়ে দিনযাপন করতে করতে আমরা বোধহয় আমাদের প্রকৃত সুখকে বিসর্জন দিয়ে দিচ্ছি এবং যাকে সুখ ভেবে ছুটে চলেছি সে আসলে সুখ-ই নয়, এক সুখের ভুলভুলাইয়া। সেখানে আমরা শুধু ঘুরেই চলি, কিছুই পাই না। এইসব কিছু বোঝার জন্য মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, এখন যেমন করছে, আমরা কি সত্যিই সুখে আছি। সিদ্ধান্ত নেবার আগে একবার ভালো করে আলোচনা করেই দেখা যাক। 
প্রথমেই বোঝা যাক, "সুখ" কি। "সুখ" বলতে আমরা কি বুঝি? সুখ আমরা সবাই চাই। সুখ মানুষের সকল প্রবৃত্তির এক পরিমিত অভ্যাস। কোনোকিছুর পরিতৃপ্তিতেই সুখ, তা সে ইন্দ্রিয়েরই হোক বা অন্যকোনো প্রবৃত্তির। মানুষ প্রবৃত্তির দাস। প্রবৃত্তি বলতে সেটা মূলত শারীরিক ও মানসিক। মানসিক প্রবৃত্তির মধ্যে কতকগুলি জ্ঞান সংগ্রহ করে, কতকগুলি কাজ করে, আর কতকগুলি শুধু আনন্দ অনুভূতি করে। জ্ঞান, কর্ম্ম, আনন্দ, এ তিন প্রবৃত্তির তিনরকম ফল। সুখ বা সচ্চিদানন্দ এই ত্রিবিধ প্রবৃত্তির ফল। এই সকলের মধ্যে সঠিক সামঞ্জস্য প্রয়োজন, নতুবা অর্জিত সুখ, দুঃখে পরিণত হয়। সকল প্রবৃত্তির বা ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সঠিক সামঞ্জস্য এর ফলে, সকলের স্ফূর্তি, পরিণতি ও পরিতৃপ্তি মাধ্যমে সঠিক সুখের সাক্ষাৎ মেলে।এখন প্রশ্ন হলো, কি ভাবে এই তিন প্রবৃত্তিকে আয়ত্ত করা যাবে এবং এই তিন প্রবৃত্তি সঠিক মিশ্রণ কি হবে যাতে সুখ সঠিক পরিমানে পাওয়া যায়। প্রথমে দেখা যাক, কেমন মিশ্রণ হওয়া দরকার। 
সাধারণভাবে আমরা ভাবি, জ্ঞানীরাই যথার্থ সুখী। কেউ ভাবে কর্মই সুখের আধার। অন্যেরা ভাবে আনন্দই প্রকৃত সুখ। কিন্তু সত্যিই কি তাই। একটু বিশদে আলোচনা করা যাক। ধরা যাক এক টুকরো মিষ্টি খেলে খুব ভালো লাগে, দুটো পেলে খুব আনন্দ, তিনটে পেলে কেউ খুব সুখী হয়। কিন্তু সবাই কি মিষ্টি খেলে সুখী হয়। না হয় না। তার আবার অন্য কিছু খেতে ভালো লাগে। কিন্তু আবার কিছু খাবার খেতে কারোরই ভালো লাগে না; যেমন, তেতো ওষুধ বা উচ্ছে। এই খাবার খেতে কেন ভালো লাগে। তার হয়তো অনেক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। আমরা সেই ব্যাখ্যায় যাবো না। আমরা ঘটনাকে অন্য ভাবে দেখবো। কেন আমাদের মিষ্টি খেতে ভালো লাগে। তার কারণ কি তার মিষ্টি স্বাদ। সেই মিষ্টি স্বাদ তো সবার ভালো লাগে না। যদি মিষ্টি স্বাদই সুখ হয়, তাহলে সবার ক্ষেত্রে তা সুখের কারণ হওয়া উচিত ছিল। তা কিন্তু হয় না। বিভিন্ন লোকের ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যবস্তু খেয়ে সুখ হয়। আবার নতুন কোনো বিশেষ খাবার, যা কখনো খাইনি, তা যদি প্রথমে একটু ভালো লাগে, চেষ্টা করলে সেই খাবার খেয়েও আমরা সুখী হতে পারি। তাহলে সুখ আমরা কোনো নতুন জিনিস থেকেও পেতে পারি। কিন্তু তার জন্যে দরকার তার বা তাকে পাবার অনুশীলন। সেই অনুশীলনই আমাদের শারীরিক ও মানসিক ইন্দ্রিয় গুলির শক্তি বিকাশে সাহায্য করে। তারই ফল প্রথমে ফুর্তি, চরমে পরিণত এবং তার পর পরিতৃপ্তি। এইগুলিই সুখের পক্ষে আবশ্যিক। এই পরিতৃপ্তি যদি অতিমাত্রায় হয়, তখন অনীহার প্রকাশ হয় এবং সুখ দুঃখে পরিণত হয়। তাই প্রয়োজন সকল প্রবৃত্তির মধ্যে সামঞ্জস্য। প্রতিটি প্রবৃত্তির নিজস্ব ধর্ম্ম আছে। কিছু প্রবৃত্তি ভালো আবার কিছু নিকৃষ্ট মানের। সাধারণভাবে মনে হয় ভালো প্রবৃত্তিগুলির অনুশীলনই সুখ।
প্রকৃতপক্ষে তা নয়। সবরকম প্রবৃত্তির প্রয়োজন আছে। কারণ কোনো একটি বিশেষ প্রবৃত্তির প্রতি অতি সাধনা বা অনুশীলন অন্য সব প্রবৃত্তির উপর প্রভাব তৈরী করে। ফলে আমরা কোনো একটি বিশেষ কাজে পারদর্শী হয়ে উঠি, আর অন্যগুলোর প্রতি অনীহা প্রকাশ করি। এই অসামঞ্জস্যের কারণে, একটা বিশেষ কাজের ক্ষেত্রে আমরা সুখী হই এবং অন্য ক্ষেত্রে অসুখী হই। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, যে পড়তে ভালোবাসে, সে খেলতে বা দৈহিক পরিশ্রমের কাজ করতে পছন্দ করে না, যে দৈহিক পরিশ্রম করতে পারে, সে হয়তো পড়তে বা খেলতে পারে না, আবার যে ভালো খেলতে পারে, সে পড়তে বা দৈহিক পরিশ্রম করতে চায় না। আমরা সবসময় একই কাজ নিয়ে থাকতে পারি না। কোনো না কোনো সময়ে আমাদেরকে নানা প্রকার কাজ করতে হয়, সে আমাদের পছন্দের হোক বা অপছন্দের। ফলে সবসময় সুখী থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠে। অন্যদিকে আবার ভিন্ন ভিন্ন কাজের প্রয়োজন আছে। যদি আমাদের শরীর রুগ্ন হয়, তাহলে পড়াশোনা বা খেলা ঠিক মত করা হয়ে উঠবে না, আবার পড়াশোনা থাকলে চাষ করে ভালো ফলন উৎপন্ন করা যাবে। অন্য দিকে, শরীরে দৈহিক বল না থাকলে বলবান ব্যক্তির কাছে সর্বদা মাথা নিচু করে বা ভয়ে থাকতে হবে। যা মোটেই সুখকর নয়।
তাই আমাদের সকল ইন্দ্রিয়গুলির সাধনা প্রয়োজন। কোনো ইন্দ্রিয়েরই বিলোপ সঙ্গত নয়, বরং সংযম প্রয়োজন - তাদের মধ্যে সামঞ্জস্য দরকার। এই সামঞ্জস্যই মানুষের সর্বাঙ্গীন উন্নতি বা পরিণতিতে সাহায্য করে - যা মানুষের মনুষ্যত্ব হিসেবে পরিগণিত হয়। তা গড়ে ওঠে বিভিন্ন প্রবৃত্তির যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে। যেমন একটি অংকুরের মধ্যে পরবর্তীকালের বিশাল মহীরুহের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, তেমনি একটি শিশুর মধ্যে এক মনীষী লুকিয়ে থাকে। অংকুর থেকে মহীরুহ হওয়ার জন্যে যেমন চাই অনুকূল পরিবেশ - মাটি, জল, রোদ এবং নানা প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক - তেমনি শিশু থেকে মানুষে পরিণত হওয়ার জন্য চাই উপযুক্ত অনুশীলন। উপযুক্ত অনুশীলনের দ্বারা শিশু প্রকৃত মনুষ্যত্ত্ব প্রাপ্ত হয়। পরিনামে সর্বগুনযুক্ত - সর্বসুখসম্পন্ন মানুষ তৈরী হবে। এটাই মানুষের পরিণতি। অনুশীলনের দ্বারা শিশুর শারীরিক ও মানসিক শক্তির বিকাশ হয় এবং কালক্রমে তার সর্বাঙ্গীন উন্নতি বা পরিণতি লাভ হয়।
শারীরিক ও মানসিক প্রবৃত্তির সর্বাঙ্গীন পরিণতি ব্যাপারটা একটু বিশদে আলোচনা করা যাক। মানুষের শরীরে অনেকগুলি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আছে। তাহাদের কাজ ভিন্ন ভিন্ন। তাহাদের মধ্যে কোনগুলি হাত-পা আদি কর্মেন্দ্রিয়, চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা-জিহ্বা-ত্বক জ্ঞানেন্দ্রিয়, মস্তিষ্ক-হৃদয়-অন্ত্র ইত্যাদি জীবনসঞ্জালক প্রত্যঙ্গ, অস্থি-মজ্জা-মাংস-রক্ত ইত্যাদি শারীরিক উপাদান এবং খিদে-পিপাসা ইত্যাদি শারীরিক বৃত্তি। এ সকলের সর্বাঙ্গীন উন্নতি দরকার। সাধারণত এদের একপ্রকার স্বাভাবিক পরিণতি হয়। সেই পরিণতির সময়ে যদি সঠিক অনুশীলন না করা হয়,তাহলে তার কর্মক্ষমতা কমে যায়। যেমন, যদি হাতে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে হাত অকর্মন্য হয়ে পর্বে। সঠিক অনুশীলনে শিশুর কোমল বাহু সবল ও দৃঢ় হয়। যেমন, অনেক গায়ক সচরাচর সুকণ্ঠী হয় না, কিন্তু অনুশীলনের দ্বারা সুকন্ঠের অধিকারী হয় - তখন বলা যায় কণ্ঠের সর্বাঙ্গীন উন্নতি হয়েছে। এভাবে সকল শারীরিক প্রত্যঙ্গের সর্বাঙ্গীন উন্নতি প্রয়োজন। ঠিক একইরকমভাবে মনের সকল প্রত্যঙ্গের (কিছুগুলি জ্ঞান সংগ্রহ করে, কিছুগুলি কর্মে প্রবৃত্তি দেয়, কিছুগুলি আনন্দ উপভোগ, সৌন্দর্য্য-রস গ্রহণ ইত্যাদি করে) পুষ্টি ও পরিপূর্ন বিকাশই তাদের সর্বাঙ্গীন পরিণতির সমার্থক।
কিন্তু এ বড় কঠিন কাজ। একসঙ্গে মানসিক ও শারীরিক শক্তিগুলির সর্বাঙ্গীন উন্নতি এককথায় অসম্ভব। সকল শক্তিগুলির সর্বাঙ্গীন পরিণতির সঠিক সংজ্ঞাও থাকা প্রয়োজন। কোনটা কত পরিমান পরিণতি হলে, সর্বাঙ্গীন পরিণতি বোঝাবে তা জানা একান্তই দরকার। ব্যাপারটা বড়ই গোলমেলে, কারণ তার কোনো সঠিক মাপকাঠি নেই। পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুযায়ী তাদের মাপকাঠি ওঠানামা করে। তাই এমন একজনকে সামনে রাখতে হবে, যাঁকে আদর্শ  নিয়ে মানসিক ও শারীরিক শক্তিগুলির সর্বাঙ্গীন উন্নতির প্রতি যত্নবান হওয়া যাবে। তাকেই সামনে রাখতে হবে, যিনি আমাদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, যার শ্রেষ্ঠতা থেকে আমরা উপকৃত হব।
সেই আদর্শ ব্যক্তির কার্য্যকলাপ আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করবে, আমাদেরকে আলোর পথ দেখাবে, আমরা আবার প্রকৃত সুখে সন্ধানে পথচলা শুরু করবো। আদর্শ মানুষের লক্ষণ বোঝাতে গিয়ে, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ধর্ম্মতত্ত্ব প্রবন্ধে বলেছেন, যে মানুষের সম্পূর্ণ ভাবে মানসিক ও শারীরিক পরিণতি হয়েছে, তিনিই আদর্শ মানুষ। সাহিত্যসম্রাটের কথায়, "জ্ঞানে পান্ডিত্য, বিচার দক্ষতা, কার্য্যে তৎপরতা, চিত্তে ধর্ম্মাত্মা এবং সুরসে রসিকতা, এই সকল হইলে, তবে মানসিক সর্ব্বাঙ্গীণ পরিণতি হইবে। আবার তাহার উপর শারীরিক সর্ব্বাঙ্গীণ পরিণতি আছে অর্থাৎ শারীর বলিষ্ঠ সুস্থ, এবং সর্ব্ববিধ শারীরীক ক্রিয়ায় সুদক্ষ হওয়া চাই"।  কিন্তু বাস্তবে এমন মানুষ পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। 
সেই আদর্শ মানুষের সন্ধানে, বেদ-রামায়ণ-মহাভারত - পুরাণ খুঁজে এমন একজনকে পাওয়া গেছে, যাঁর সম্বন্ধে অকপটে বলা যায়, "তাঁহার শারীরিক বৃত্তিসকল সর্বাঙ্গীণ স্ফূর্ত্তি প্রাপ্ত হইয়া অননুভবনীয় সৌন্দর্য্যে এবং অপরিমেয় বলে পরিণত; তাঁহার মানসিক বৃত্তিসকল সেইরূপ স্ফূর্ত্তি প্রাপ্ত হইয়া সর্ব্বলোকাতীত বিদ্যা, শিক্ষা, বীর্য্য এবং জ্ঞানে পরিণত, এবং প্রীতিবৃত্তির তদনুরূপ পরিণতিতে তিনি সর্ব্বলোকের সর্ব্বহিতে রত।" 
তাঁর সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র এইরকম বলেছেন, "যিনি বাহুবলে দুষ্টের দমন করিয়াছেন, বুদ্ধিবলে ভারতবর্ষ একীভূত করিয়াছেন, জ্ঞানবলে অপূর্ব্ব নিষ্কাম ধর্ম্মের প্রচার করিয়াছেন, আমি তাঁহাকে নমস্কার করি। যিনি কেবল প্রেমময় বলিয়া নিষ্কাম হইয়া এই সকল মনুষ্যের দুষ্কর কাজ করিয়াছেন, যিনি বাহুবলে সর্ব্বজয়ী এবং পরের সাম্রাজ্য স্থাপনের কর্ত্তা হইয়াও আপনি সিংহাসনে আরোহণ করেন নাই, যিনি শিশুপালের শত অপরাধ ক্ষমা করিয়া ক্ষমাগুণ প্রচার করিয়া, তার পর কেবল দণ্ডপ্রণেতৃত্ব প্রযুক্তই তাহার দণ্ড করিয়াছিলেন, যিনি সেই বেদপ্রবল দেশে, বেদপ্রবল সময়ে, বলিয়াছিলেন, “বেদে ধর্ম্ম নহে-ধর্ম্ম লোকহিতে”-তিনি ঈশ্বর হউন বা না হউন, আমি তাঁহাকে নমস্কার করি। যিনি একাধারে শাক্যসিংহ, যীশুখৃষ্ট, মহম্মদ ও রামচন্দ্র; যিনি সর্ব্ববলাধার, সর্ব্বগুণাধার, সর্ব্বধর্ম্মবেত্তা, সর্ব্বত্র প্রেমময়, তিনি ঈশ্বর হউন বা না হউন, আমি তাঁহাকে নমস্কার করি।" 
হ্যাঁ, উপরের কথাগুলি কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে বলা। এই লেখাটিতে কৃষ্ণকে আদর্শ মানুষ হিসেবে ভাবা হয়েছে। এই কৃষ্ণ মহাভারতের কৃষ্ণ। এই কৃষ্ণ শ্রীমহাভাগবত পুরানের কৃষ্ণ নয়। এই কৃষ্ণ ব্রহ্মবৈবত্ত্বপুরানের  কৃষ্ণ নয়, নয় হরিবংশ অথবা জয়দেবের কৃষ্ণ। ইনি সম্পূর্ণভাবে মহাভারতের কৃষ্ণ। যেখানে তিনি দেবতা হিসেবে চিত্রিত নয়। এক আদর্শ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মানুষ কতদূর উন্নত হতে পারে - বল -বুদ্ধি - জ্ঞান সর্ববিষয়ে কিরূপ উৎকর্ষ লাভ করতে পারে, মহাভারতের কৃষ্ণ-চরিত্র তারই প্রতিফলন। সর্বাঙ্গীন পরিণতি লাভ করতে হলে, কোন ধরণের মানুষকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা কর্তব্য, কৃষ্ণচরিত্রের মাধ্যমে তা পরিস্ফুট হয়েছে। তাঁর কাছে অহিংসাও ধর্ম, আবার হিংসাও ধর্ম; সত্যও ধর্ম, আবার অসত্যও ধর্ম; কামনাও ধর্ম, আবার নিষ্কামও ধর্ম। কর্তব্য নির্ধারণ এবং সমস্যার মীমাংসা, নীতিতত্ত্ব - ধর্মতত্ত্ব - কৃষ্ণের নীতির প্রধান অঙ্গ।
কৃষ্ণদ্বেষীদিগের কাছে যে কথা কৃষ্ণচরিত্রের প্রধান কলঙ্ক, এবং আধুনিক কৃষ্ণউপাসকদের কাছে যাহা কৃষ্ণভক্তির মূল "কৃষ্ণের সহিত ব্রজ গোপীদের সম্বন্ধ"|মহাভারতে ব্রজগোপীদের কথা কিছুই নাই। সভাপর্বে শিশুপালবধ-পর্বে শিশুপাল দ্বারা যে সবিস্তার কৃষ্ণনিন্দা আছে।যদি মহাভারতের সময় ব্রজগোপীগণঘটিত কৃষ্ণের এই কলঙ্ক থাকত, তাহলে, শিশুপাল অথবা যিনি শিশুপালবধবৃত্তান্ত লিখেছেন, তিনি কখনই কৃষ্ণনিন্দাকালে তাহা পরিত্যাগ করতেন না। অতএব একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে,মুল মহাভারত রচনাকালে এ কথা চলিত ছিল না - তার পরে তা লেখা হয়েছে।  এই ব্রজগোপীতত্ত্ব মহাভারতে নাই, বিষ্ণুপুরাণে পবিত্রভাবে আছে, হরিবংশে প্রথম কিঞ্চিত বিলাসিতা প্রবেশ করেছে, তাহার পর ভাগবতে আদিরসের অপেক্ষাকৃত বিস্তার হয়েছে, শেষ ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে তাহার স্রোত বয়েছে। অবশেষে জয়দেবের সময়ে তা উন্নতির শিখরে উঠেছে। উপনিষদে রাসলীলার কোন কথাই নাই। রাধার নামমাত্র নাই। সমস্ত ভাগবতে কোথাও রাধার নাম নাই। ভাগবতে কেন, বিষ্ণুপুরাণে, হরিবংশে বা মহাভারতে কোথাও রাধার নাম নাই। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে আর জয়দেবের কাব্যে ভিন্ন কোন প্রাচীন গ্রন্থে রাধা নাই। 
কৃষ্ণ রাজা নন বা রাজা হওয়া তাঁর ইচ্ছে নয়, অথচ তিনি তা করতে পারতেন।কারণ কংসবধ করে কংসের পিতা উগ্রসেনকে রাজ্যে অভিষেক করেছেন। কারণ ধর্মত সে রাজ্য উগ্রসেনের। অতএব যার রাজ্য, তাকেই রাজ্য প্রদান করলেন। তাই নিজে রাজা হলেন না। তিনি আবার যাদবেরও রাজা নন। কিন্তু তিনি চাইলেই তা হতে পারতেন। এই কংসবধেই দেখা  যে, কৃষ্ণ পরম বলশালী, পরম কার্যদক্ষ, পরম ন্যায়পর, পরম ধর্মাত্মা, পরহিতে রত, এবং পরের জন্য কাতর। এখান হইতে দেখিতে পাই যে, তিনি আদর্শ মানুষ।
কৃষ্ণ আদর্শ ধার্মিক, যাহা বিনা যুদ্ধে সম্পন্ন হতে পারে, তার জন্য তিনি কখনও যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন নি। মহাভারতের কোন স্থানেই এ নেই যে, কৃষ্ণ ধর্মার্থ ভিন্ন অন্য কারণে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়েছেন। আত্মরক্ষার্থ ও পরের রক্ষার্থ যুদ্ধ ধর্ম, আত্মরক্ষার্থ বা পরের রক্ষার্থ যুদ্ধ না করা পরম অধর্ম। কৃষ্ণ কখনও অন্য কারণে যুদ্ধ করেন নাই। আর ধর্মস্থাপন করার জন্য তাঁর যুদ্ধে আপত্তি ছিল না। যেখানে যুদ্ধ ছাড়া  ধর্মের উন্নতি নেই, সেখানে যুদ্ধ না করাই অধর্ম। কেবল কাশীরাম দাস বা কথকঠাকুরদের দ্বারা কথিত মহাভারতে যাঁদের অধিকার, তাঁদের বিশ্বাস, কৃষ্ণই সকল যুদ্ধের মূল; কিন্তু মূল মহাভারত সঠিকভাবে পড়লে এরূপ বিশ্বাস থাকে না। তখন বুঝতে পারা যায় যে, ধর্মার্থ ভিন্ন কৃষ্ণ কখনও কাহাকেও যুদ্ধে প্রবৃত্তি দেন নি, নিজেও ধর্মার্থ ভিন্ন যুদ্ধ করেননি। সে দ্রৌপদীর স্বয়ম্ভর সভা-ই হোক বা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হোক।
আদর্শ মানুষের শিক্ষা আদর্শ শিক্ষাই হবে। মহাভারতের সভাপর্বে কৃষ্ণের পূজ্যতা বিষয়ে ভীষ্ম বলেছেন যে, কৃষ্ণ নিখিল বেদবেদাঙ্গ পারদর্শী। এমন একজন বেদবেদাঙ্গজ্ঞান সম্পন্ন দ্বিতীয় ব্যক্তি দুর্লভ। আবার মহাভারতের শিশুপালের কৃষ্ণনিন্দা থেকে জানা যায়, কৃষ্ণ বেদশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। জরাসন্ধ-বধ পর্বে দেখা যায়, তিনি যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। সেইসঙ্গে তিনি যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী, তিনি পরম রাজনীতিজ্ঞ এবং অনর্থক মনুষ্যহত্যার নিতান্ত বিরোধী।
কৃষ্ণের বিরুদ্ধে আর একটা সবচেয়ে সাংঘাতিক অভিযোগ এই যে তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মূল হোতা। কিন্তু মহাভারত ঠিকভাবে পড়লে বোঝা যায় কথাটি একদম উল্টো। কৃষ্ণ সর্বতোভাবে যুদ্ধ বন্ধের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। উদ্যোগপর্বে তিনি পাণ্ডবের মন্ত্রণা সভায়, কুরু-পাণ্ডবের পক্ষে যা হিতকর, ধর্ম ও উপযুক্ত, তার পক্ষে মত দিয়েছেন। আবার তিনি কিন্তু কাউকে ঠকিয়ে বা বঞ্চনার বিরোধী। তাই পাণ্ডবদের পক্ষ নিয়ে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। যখন সবাই যুদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন, তখনও তিনি যুদ্ধের পরিবর্তে সন্ধি স্থাপনে আগ্রহী, তাতে যদি সামান্য রাজ্যও পাণ্ডবদের থাকে। তার জন্যে তিনি দূত কথা বলতেও রাজি। আবার এও বলেছেন, যদি যুদ্ধ হয় তাহলে তিনি অস্ত্র ধারণ করবেন না। সন্ধির সময়ে দুর্যোধন তাকে বন্দি করার চেষ্টা করলেও তিনি তাকে ক্ষমা করেন। তিনি আবার কৌরব ও পাণ্ডবদের সমান চোখে দেখতেন। যুদ্ধ্বে দুপক্ষকেই সাহায্য করেছেন। একদিকে নিজের সেনা ও ওপর পক্ষে নিজে থেকে, যুদ্ধ না করে। তার উপর তিনি সারথির মত ছোট কাজও করেছেন। কারণ আদর্শ মানুষ অহংকারশূন্য। তিনি সর্বদোষশূন্য ও সর্বগুণান্বিত। 
 তিনি জ্ঞান, ধর্ম ও বাহুবলে সকলের প্রধান হইয়াছিলেন। সকল বৃত্তিগুলিই সম্পূর্ণরূপে অনুশীলিত করিয়াছিলেন, তাহারই ফল এই প্রাধান্য। সকল বৃত্তিগুলি অনুশীলিত না হইলে, কেহই তাদৃশ ফলদায়িনী হয় না। সর্বগুণসম্পন্ন আদর্শ মনুষ্য কার্যবিশেষে জীবন সমর্পণ করতে পারেন না। তাহলে, ইতর কাজগুলি অসামঞ্জস্যের সহিত অনুষ্ঠিত হবে। লোক চরিত্রভেদে, অবস্থাভেদে, শিক্ষাভেদে ভিন্ন ভিন্ন কর্ম ও ভিন্ন ভিন্ন সাধনের অধিকারী; আদর্শ মানুষ, সকল শ্রেণীরই আদর্শ হওয়া উচিত। এই জন্য শ্রীকৃষ্ণের, শাক্যসিংহ, যিশু বা চৈতন্যের ন্যায় সন্ন্যাস গ্রহণপূর্বক ধর্ম প্রচার ব্যবসায়স্বরূপ অবলম্বন করা অসম্ভব। কৃষ্ণ সংসারী, গৃহী, রাজনীতিজ্ঞ, যোদ্ধা, দণ্ডপ্রণেতা, তপস্বী, ধর্মপ্রচারক; সংসারী ও গৃহীদিগের, রাজাদিগের, যোদ্ধাদিগের, রাজপুরুষদিগের, তপস্বীদিগের, ধর্মবেত্তাদিগের এবং একাধারে সর্বাঙ্গীণ মনুষ্যত্বের আদর্শ।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: 
১. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, "কৃষ্ণচরিত" এবং "ধর্মতত্ত্ব" 
২. দুর্গাদাস লাহিড়ী, "পৃথিবীর ইতিহাস", প্রথম খন্ড

(লেখাটিতে হয়তো একটু গুরুচন্ডালী দোষ ঘটলেও ঘটতে পারে। পাঠক নিজগুনে ক্ষমা করে দেবেন এই আশা করি)

No comments:

Post a Comment